ক্যানভাসে আঁকা ছবি

 

ক্যানভাসে আঁকা ছবি

                            নাছির উদ্দিন

ঢাকার ধানমন্ডির লেকপাড়ে বসে এক শীতকালীন সন্ধ্যা গল্পের নায়ক অরূপ, এক নিরহঙ্কারী, গভীর মনের মানুষ অরূপ। তার স্বপ্ন বড় শিল্পী হওয়ার। তাই সে সব সময় ছবি আঁকতো, ছবি আঁকাটা তার পেশা নয় যেন নেশায় পরিণত হয়ে গেছে। একদিন তার ক্যানভাসে রং মিশিয়ে এক নারীর মায়াবী মুখ আঁকছিল। মুখটি বাস্তব নয়, কিন্তু তার মনে হতো, সেই মুখই তার জীবনের অর্থ। হঠাৎ সেই মুখের মিল খুঁজে পায় পূর্ণিমা নামের এক মেয়ের মাঝে। 

পূর্ণিমা, সাহসী, স্নিগ্ধ এবং খুবই সংবেদনশীল। তার হাসিতে যেন এক অদ্ভুত মায়া। তাদের প্রথম দেখা হয় এক চিত্র প্রদর্শনীতে। পূর্ণিমা অরূপের আঁকা ছবি দেখে মুগ্ধ হয়। পূর্ণিমা বললো "তোমার ছবিতে এতো আবেগ কিভাবে আসে?"

অরূপ হেসে উত্তর দেয়, "আবেগ শুধু অনুভব করলেই বোঝা যায়। তুমি কি অনুভব করছ?"

এই কথার সূত্র ধরে তাদের আলাপ গভীর হয়। তারা মধুর সময় কাটাতে লাগে একে অপরের সাথে, আর তাদের প্রেমের গল্প ঢাকার লেকপাড়, কফির দোকান আর শহরের ব্যস্ত রাস্তায় মিশে যায়।

অরূপ আর পূর্ণিমার প্রেম এক গভীর বন্ধনে বাঁধা পড়ে। অরূপ তাকে তার জীবনের ক্যানভাসে আঁকতে শুরু করে। পূর্ণিমা বলে, "তুমি কি জানো, তোমার আঁকা ছবি আমার আত্মাকে স্পর্শ করে?"

তাদের জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত যেন প্রেমের কবিতা হয়ে উঠছিল।

"তোমার চোখে দেখি,

অন্তহীন এক আকাশ।

যেখানে শুধু আমি আর তুমি,

কোনো সময় নেই, নেই কোনো বাধা,

থাকবো দুজন দুজনারি।"

কিন্তু সুখের এই গল্পের ভিতরেই লুকিয়ে ছিল এক অদৃশ্য অন্ধকার।

পূর্ণিমার জীবনে ঝড়ো হাওয়ার বেগে হঠাৎ প্রবেশ করেল অয়ন। অয়ান একজন ধনী ব্যবসায়ী, উচ্চাভিলাষী এবং চতুর স্বভাবের। সে পূর্ণিমার বাবার ব্যবসার অংশীদারও ছিল বটে। প্রথমে অয়ন ছিল শুধু পরিচিত, কিন্তু ধীরে ধীরে সে পূর্ণিমার প্রতি আগ্রহ দেখাতে শুরু করে।

অয়ন প্রতিদিন তাকে ফোন করে, অফিসের কাজে তাকে সাহায্যে করে, এমনকি তার জন্য বিভিন্ন সময় বিভিন্ন উপহার পাঠায়। পূর্ণিমা প্রথমে এই বিষয়গুলো উপেক্ষা করলেও, সময়ের সাথে অয়নের উপস্থিতি তাকে প্রভাবিত করতে শুরু করে। তার কাছে ভালো লাগতে শুরু করে এই ব্যাপার গুলো। এভাবে চলতে থাকে কিছুদিন। এখন পূর্ণিমার ভালো লাগে তার সাথে তার সাথে সময় কাটাতে। অরূপ বিষয়টি বুঝতে পারে এবং তাদের মধ্যে সন্দেহের দেয়াল তৈরি হয়।

অরূপ একদিন পূর্ণিমাকে জিজ্ঞাসা করে, "অয়ন কি তোমার জীবনে জায়গা নিচ্ছে?"

পূর্ণিমা বিরক্ত হয়ে উত্তর দেয়, "তোমার এই সন্দেহ আমার জন্য অসহনীয় হয়ে উঠছে।"

তাদের সম্পর্কের মধুরতা আস্তে আস্তে করে তিক্ততায় রূপ নেয়। পূর্ণিমা ধীরে ধীরে অয়নকে বেশি সময় দিতে শুরু করে, আর অরূপ এই পরিবর্তন মেনে নিতে পারে না। একদিন অরূপ একটি পার্টিতে গিয়ে দেখে, পূর্ণিমা এবং অয়ন খুব ঘনিষ্ঠভাবে কথা বলছে। এই দৃশ্য অরূপের মন ভেঙে দেয়। সে রাগ করে পার্টি ছেড়ে চলে যায়। বলে যায় বিধ্বংসী নারী তুই কি ভালোবাসার মর্যাদা দিতে পারলি না, তবে এই ছিল তোর মনে।

পূর্ণিমা এখন দিধায় পড়ে যায় সে কি করবে কাকে বেছে নিবেন তার সামনে দুইটা পথ এক একটি পথ হল অরুপের সাথে তার জীবন কাটিয়ে দেওয়া অন্য পথ হল অয়নের সাথে বিলাসবহুল জীবন যাপন করা।

অরূপ আর পূর্ণিমার মধ্যে দূরত্ব বাড়তে থাকে। একদিন অরূপ একটি অজ্ঞাত নম্বর থেকে ফোন পায়। ফোনের অপর প্রান্তে একজন বলে,

"তোমার প্রেমিকার সঙ্গে থাকাটা এখন বিপদজনক। সাবধান হয়ে যাও।"

অরূপ বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। সে বুঝতে পারে, কেউ তার এবং পূর্ণিমার জীবন নিয়ে খেলছে।

একদিন রাতে অরূপ তার স্টুডিওতে কাজ করছিল। স্টুডিও টা ছিল একটু অন্ধকারাচ্ছন্ন জায়গায়, প্রকৃতির কাছে এক নিরিবিলি জায়গায়, এখানে সে তার মনের শান্তিতে তার ক্যানভাসে সব ফুটিয়ে তুলতো, তার স্টুডিওতে ছিল বিশাল এক মাছের একুরিয়াম, সে মাছ খুব ভালোবাসতো, আর এক পাশে ছিল তার আঁকা পূর্ণিমার সেই ছবি। মনের আনন্দে বসে সে তার জাদুর হাত দিয়ে ক্যানভাস সাজাচ্ছিল। হঠাৎ সে টের পায়, কেউ তাকে অনুসরণ করছে। সে বাইরে এসে কাউকে দেখতে পায় না।

অন্যদিকে, পূর্ণিমার আচরণ আরো রহস্যময় হয়ে ওঠে। সে অরূপকে প্রায়ই এড়িয়ে চলতে শুরু করে। এখন তার অরূপ কিছুই ভালো লাগেনা।

এক সন্ধ্যায় অরূপ পূর্ণিমাকে দেখতে তার বাসায় যায়। কিন্তু বাসায় গিয়ে জানতে পারে, পূর্ণিমা বাইরে গেছে। ওখান থেকে কষ্টে ভরা মন নিয়ে সে চলে যায় তার স্টুডিওতে। সেই রাতে, অরূপের মৃতদেহ পাওয়া যায় তার স্টুডিওতে।

অরূপের মৃত্যু ছিল রহস্যজনক। তার শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন ছিল না, কিন্তু তার চারপাশে ছিল ভাঙা কাচ, আর সেই ছবিটি ছিল মাটিতে পরা। এবং দেয়ালে রক্ত দিয়ে লেখা ছিল একটি বাক্য:

"বিশ্বাস করো, আমি তোমাকে শেষ পর্যন্ত ভালোবেসেছি।"

অরূপের মৃত্যু সবাইকে হতবাক করে। তদন্ত শুরু হয়, এবং সন্দেহের তীর প্রথমে পূর্ণিমার দিকে যায়। পুলিশ জানতে পারে, অরূপের মৃত্যুর রাতে পূর্ণিমা অয়নের সঙ্গে ছিল।

অয়ন দাবি করে, "আমি সেদিন পূর্ণিমাকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলাম। সে খুবই কষ্টে ছিল, কারণ অরূপের সঙ্গে তার সম্পর্ক ভেঙে গিয়েছিল।"

কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়:

অরূপ কি আত্মহত্যা করেছে?

নাকি তাকে খুন করা হয়েছে?

যদি খুন হয়, তবে সেটা কি পূর্ণিমা আর অয়ানের কাজ?

তদন্ত যত এগোয়, রহস্য তত ঘন হতে থাকে। পূর্ণিমা বারবার অরূপের প্রতি তার ভালোবাসার প্রমাণ দেয়। কিন্তু তার অস্বাভাবিক আচরণ সবাইকে চমকে তোলে।

অরূপের স্টুডিওতে পাওয়া একটি অসমাপ্ত চিঠি ছিল গল্পের একমাত্র সূত্র। সেই চিঠিতে লেখা ছিল:

"তোমার মায়ার মধ্যে আমি হারিয়ে গেছি। কিন্তু তোমার চোখের অন্য গল্প আমাকে কষ্ট দেয়। যদি আমি তোমার জন্য অপূর্ণ থেকে যাই, তবে আমার এই ভালোবাসা চিরতরে শেষ হয়ে যাবে।"

কেসটি এখনো সমাধান হয়নি। কেউ জানে না, অরূপের মৃত্যুর পেছনে আসল সত্য কী। এর পর পূর্ণিমার জীবনেও এক অন্ধকার নেমে এল।অরূপের অসমাপ্ত চিত্র এবং একটি রহস্য, যা চিরকাল তাকে তাড়া করে। 


"ভালোবাসা যখন বিশ্বাস হারায়, তখন তা এক ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। আর সেই ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে যায় সব গল্প, সব উত্তর।"


আসলে এই গল্পের ভিলেনকে পূর্ণিমা, অয়ন নাকি অন্য কেউ??



প্রথম পাট এখানে শেষ……….

Published Date: 15/01/2025




 About Author 

Name: Nasir Uddin 

Student at World University of Bangladesh 

Contact:  Facebook    YouTube 

Post a Comment

2 Comments

  1. হুম,দারুন লাগছে 🥰🥰

    ReplyDelete
  2. Eto shundor kore likhechen..darun

    ReplyDelete

Thanks for your comment!